অহন সেই খালের ম্যালা জায়গায় পানি থম ধইরা থাকে। পানির ওপর কচুরিপানা, ময়লা-আবর্জনা ভাসে। কোথাও জমা পানিতে দুর্গন্ধ ছড়ায়। খালের ওপর সেতু বানাইবার লাইগ্যা দেওয়া বানও কোনো কোনো জায়গায় পানির স্বাভাবিক চলাচলে বাধা অইয়া খাঁড়াইয়া আছে।
তাই পুশ্নডা খুবই স্বাভাবিক। এত বছর ধইরা এত ট্যাকা খরচ কইরা, ম্যালা প্রকল্প নিয়া, বারবার খনন আর সৌন্দর্যবর্ধন কইরাও মানিকগঞ্জের এই খালডা স্বাভাবিক অইল না ক্যান?
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রায় ৬ কিলোমিটার লম্বা মানিকগঞ্জ শহরের এই খাল সংস্কার আর সৌন্দর্যবর্ধনের লাইগ্যা প্রায় দুই দশকে তিন দফায় ৫২ কোটি ৩৮ লাখ ৪৬ হাজার ৮৭৩ ট্যাকা ৮০ পয়সার প্রকল্প নেওয়া অইছে। সর্বশেষ ২০২২ সালে শুরু অইয়া প্রকল্পডার প্রাক্কলিত খরচ প্রায় ২৮ কোটি ট্যাকা।
এই প্রকল্পের মধ্যে খাল পুনঃখনন, পাড় সংরক্ষণ, হাঁটার রাস্তা, সৌন্দর্যবর্ধন, তিনডা সেতু আর এ্যাক্টা গণশৌচাগার বানানোসহ ম্যালা কাম আছে। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ অইলেও কাম পুরাপুরি শেষ অয় নাই। পৌরসভার হিসাবে কাম প্রায় ৯৬ শতাংশ শেষ অইছে।
এই খালের গপ্পো অবশ্য নতুন না। ২০০৭ সালে প্রথম বড় পরিসরে খাল রক্ষা আর সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া অয়। পরে ২০০৮ থিকা ২০১২ সাল পর্যন্ত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় খাল খনন, পাড় বাঁধানো, সিসি ব্লক বসানো আর হাঁটার রাস্তা বানাইতে ১৮ কোটি ২৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৭৭ ট্যাকা খরচ অইছে।
খালের প্রায় ১ হাজার ৪৪০ মিটার জায়গায় নতুন কইরা সিসি ব্লক বসানো অইছিল। কিন্তু কয়েক বছর যাইতে না যাইতেই সেই খাল আবার ময়লা-আবর্জনায় ভইরা যায়।
২০১৬ সালের শেষের দিকেও খাল পরিষ্কার কইরা হেইহ্যানে মাছ চাষের পরিকল্পনা করা অইছিল। সেই উদ্যোগও টেকসই অয় নাই। নিয়মিত দেখভাল না থাকায় আবার কচুরিপানা, বর্জ্য আর ময়লা জমছে। অর্থাৎ সমস্যা যে খালি খননের অভাবে, হেইডা তখনই বুজা যাওনের কথা আছিল।
এরপরও ২০২২ সালে আবার নতুন প্রকল্প নেওয়া অইল। তখনই পুশ্ন উঠছিল, আগের প্রকল্প থিকা কী শেখা অইছে?
কারণ ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে পরিষ্কার কইরা বলা অইছিল, আগের প্রকল্পে বিপুল ট্যাকা খরচ অইলেও খালের উৎসমুখ ঠিকমতো খনন করা অয় নাই। ফলে পানির স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করা যায় নাই। বর্ষার পানির লগে পলি আইয়া খাল আবার ভইরা যাওনের আশঙ্কাও আছিল।
ওই প্রতিবেদনে নাগরিক সমাজের পক্ষ থিকা কওয়া অইছিল, খালের দুই পাড়ের অবৈধ দখল উচ্ছেদ আর সারা বছর পানির চলাচল ধইরা রাখনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া নতুন প্রকল্প নিলেও কাঙ্ক্ষিত লাভ অইব না।
আইজ কয়েক বছর পর হেই আশঙ্কারই ছবি দেখা যাইতেছে।
খালের সর্বশেষ প্রকল্পের কাম শুরু অইছিল ২০২২ সালের ১০ মে। প্রথমে দুই বছরের মধ্যে, মানে ২০২৪ সালের ১০ মে কাম শেষ করার কতা আছিল। পরে সময় বাড়াইয়া ২০২৫ সালের ১০ জুন করা অয়। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যেও কাম শেষ অয় নাই।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাম বন্ধ রাইখছিল। পরে আবার কাম শুরু অয়। সর্বশেষ পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগের ভাষ্য, কাম প্রায় ৯৬ শতাংশ শেষ অইছে।
কাম যদি ৯৬ শতাংশই শেষ অইয়া থাকে, তাইলে সমস্যা কই?
সমস্যাডা অইল, একটা খালরে খালি প্রকল্পের কাম দিয়া বাঁচাইতে পারা যায় না। খালের আসল প্রাণ অইল পানি। পানি চলাচল না করলে নতুন পাড়, নতুন হাঁটার রাস্তা কিংবা নতুন সৌন্দর্যবর্ধন, কুনোটাই খালরে জীবন্ত রাইখতে পারব না।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে স্থানীয় মাইনষে জানাইছেন, খালের দুই জায়গায় সেতু বানাইবার লাইগ্যা বান দেওয়া অইছিল। সেতুর কাম শেষ অইলেও ওই বান খুইল্যা ফেলা অয় নাই। ফলে পানির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত অইতেছে।
কোথাও পানি আটকা থাকতেছে, হেইখানে ময়লা জমতেছে, দুর্গন্ধ ছড়াইতেছে আর মশার উপদ্রব বাড়তেছে।
এর লগে আছে আরেক পুরোনো সমস্যা, বর্জ্য। বাসাবাড়ি, হোটেল-রেস্তোরাঁ আর বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য খালে ফালানোর অভিযোগ ম্যালা বছর ধইরাই আছে।
২০২২ সালে সরেজমিন প্রতিবেদনে খালের পাড়ে গইড়া ওঠা স্থাপনা আর পাইপ দিয়া পয়ঃবর্জ্য খালে ফালানোর কতা উঠছিল। ২০১৫ সালেও খালের দখল আর দূষণ নিয়া প্রতিবেদন প্রকাশ অইছিল।
মানে সমস্যা এ্যাম্বা এক দিনের না। আবার খালি বর্তমান প্রকল্পের কাম দিয়া এর সমাধানও অইব না।
এই জায়গাতেই মানিকগঞ্জের খাল নিয়া আমাগো চিন্তার ধরন বদলানো দরকার।
আমরা উন্নয়ন কইতে অনেক সময় নতুন কুনো কিছু বানানোই বুজি। খাল আছে, তাই খনন করতে অইব। খালের পাড় আছে, তাই ব্লক বসাইতে অইব। হাঁটার জায়গা নাই, তাই হাঁটার রাস্তা বানাইতে অইব। সেতু দরকার, তাই সেতু বানাইতে অইব। সৌন্দর্য বাড়াইতে অইব, তাই সৌন্দর্যবর্ধন করতে অইব।
কিন্তু এই ব্যাবাক কাম শেষ অইবার পর খালডা তার আসল কাম করতে পারতেছে কি না, হেই পুশ্নডাই যেন আড়ালে পইড়া যায়।
একটা খালের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য অইল তার পানির স্বাভাবিক চলাচল। হেইখানে নৌকা চলুক আর নাই চলুক, অন্তত পানি চলাচল করব, শহরের পানি নামাইতে সাহায্য করব, বর্জ্য ফালানোর জায়গা অইব না, দুই পাড় দখল অইব না, বর্ষার সময় শহররে জলাবদ্ধতা থিকা রক্ষা করব, এইডাই অওন উচিত সাফল্যের মাপকাঠি।
মানিকগঞ্জের খালডা প্রায় ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার লম্বা। পশ্চিম বান্দুটিয়া বা বেউথা এলাকার কালীগঙ্গা নদী থিকা এর উৎপত্তি। শহরের মধ্য দিয়া বইয়া সোনাকান্দর বা সন্তোষপুর এলাকায় গিয়া আবার কালীগঙ্গায় মিশছে।
মানে এইডা বিচ্ছিন্ন কুনো জলাশয় না। নদী আর শহরের পানি ব্যবস্থার লগে জোড়া এ্যাক্টা গুরুত্বপূর্ণ জলপথ।
এই জায়গাডাই সবচেয়ে জরুরি। খালের উৎসমুখ ঠিক না থাকলে, পানির চলাচল স্বাভাবিক না অইলে, খালে ময়লা ফালানো বন্ধ না অইলে আর দখল ঠেকানো না গেলে বারবার খনন কইরাও স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন।
তাই এবার মানিকগঞ্জের খাল নিয়া নতুন কইরা প্রকল্প নেওনের আগে পুরোনো প্রকল্পগুলার হিসাব-নিকাশ প্রকাশ্যে আনা দরকার।
কুন প্রকল্পে কত ট্যাকা বরাদ্দ আছিল, কত ট্যাকা খরচ অইছে, কী কাম করার কতা আছিল, কতটুকু অইছে, কামডার মান কেমন আছিল আর কাম শেষ অইবার পর ক্যান কয়েক বছরের মধ্যেই খাল আবার আগের অবস্থায় ফিরা গেল, এই পুশ্নগুলার জবাব নাগরিকদের জানা দরকার।
এইডা কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলনের লাইগ্যা না। বরং সরকারি ট্যাকার ঠিকঠাক ব্যবহার নিশ্চিত করার লাইগ্যা। একটা প্রকল্প শেষ অইয়া গেলে তার সাফল্য খালি কাগজে-কলমে ‘কাম শেষ’ কইরা রাইখলে অইব না। মাইনষের চোখে তার ফল দেখা যাইতে অইব।
মানিকগঞ্জ শহরের মাইনষে হেই ফল দেখতে চান। তাঁরা চান খালে পানি থাকুক। ময়লা না থাকুক। দুর্গন্ধ না থাকুক। বর্ষার পানি তাড়াতাড়ি নামুক। খালের দুই পাড় দখলমুক্ত থাকুক। মাইনষে হাঁটতে পারুক। পোলাপান এ্যাক্টা সুন্দর জলপথ দেখতে পাক। শহরের পুরোনো এই জলপথ আবার শহরের অংশ অইয়া উঠুক।
এই লাইগ্যা নতুন কইরা কোটি কোটি ট্যাকা বরাদ্দ দেওনের আগে সবচেয়ে জরুরি কাম অইতে পারে আরেক কিছু।
খালের পানির পথডা কই থিকা কই, হেইডা আগে নিশ্চিত করা দরকার। কই দখল, কই বর্জ্যের সংযোগ, কই বাধা, কই পলি জমতেছে, কই পানি আটকা যাইতেছে, হেইগুলার এ্যাক্টা পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র বানাইতে অইব।
এরপর খনন, দখল উচ্ছেদ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আর নিয়মিত দেখভাল, ব্যাবাক কিছু এ্যাক্টা পরিকল্পনার মধ্যে আনতে অইব।
শহরের খালরে খালি সাজাইলে অইব না, বাঁচাইতে অইব।
কারণ খাল মইরা গেলে খালি এ্যাক্টা জলপথ হারায় না। হারায় এ্যাক্টা শহরের স্মৃতি, পানি নামাইবার স্বাভাবিক ব্যবস্থা আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের লাইগ্যা এ্যাক্টা জীবন্ত জলাধার।
মানিকগঞ্জের এই খাল একসময় শহরে নৌকা আনছে, পণ্য আনছে, শহররে জলাবদ্ধতা থিকা রক্ষা করছে। অহন তার সামনে সবচেয়ে বড় দরকার আরেকডা সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প না, বরং দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা আর দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা।
প্রায় দুই দশকে তিন দফা বড় প্রকল্প নেওনের পরও যদি খালের পানি স্বাভাবিক না অয়, তাইলে এবার পুশ্নডা হওয়া দরকার, আর কত ট্যাকা খরচ করলে খাল বাঁচব, হেইডা না; বরং এত ট্যাকা খরচ অইবার পরও খাল বাঁচল না ক্যান?
এই পুশ্নের জবাব খুঁজতে পারলেই হয়তো মানিকগঞ্জের খালডারে সত্যিকার অর্থে বাঁচাইবার রাস্তা বাইর অইব।